মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাস্তবতা ও মহান বিজয় দিবস

নিজস্ব প্রতিনিধি

বাংলাদেশে ডিসেম্বর মাস আসলেই চলে আসে বিজয়ের কথা, চলে আসে মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সুবিচার ও গণতন্ত্র ।

বাংলাদেশ নামক ভুখণ্ডের জন্মের সাল ১৯৭১। আসলেই কি জন্মটা ১৯৭১ সালেই হয়েছিল? বাস্তবে এই দেশটিকে পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত করার লড়াই শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগেই। সালের অর্থে আমরা ১৯৫২ সালকেই ধরতে পারি ভিত্তি স্থাপনের সাল। তারপরের প্রতিটা বছরই কোনও না কোনোভাবে লড়াইয়ের বছর হিসেবেই পরিচিত, যার চূড়ান্ত ফল এসেছে ১৯৭১ সালে, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। সেই যুদ্ধে কত মানুষ মারা গিয়েছিল, কারা লড়েছিল আর কারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, সেসব নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে। কিন্তু মূল যে কথা, যেটাকে ধারণ করে আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে এসেও আমরা তর্ক করি, তিরষ্কার করি বা ব্যাখ্যা করি, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা আসলে কী এবং কিভাবে নির্ধারণ করা যাবে, কার ভেতরে কতটা চেতনা বহমান?

আজকাল দুটি শব্দ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। কথার ফাঁকে যেকোনো প্রসঙ্গে এই শব্দগুলোর উল্লেখ প্রায়ই শোনা যায়। দুঃখের বিষয় হলো, অনেককে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে ঠিক এর বিপরীত কাজ করে যাচ্ছেন।

যেসব কারণে বাংলাদেশের মানুষ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিল এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছে, সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলা যায়। সেখানে প্রথমত আসে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা। নিজের ভাষা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসহ আলাদা পরিচয় বাঁচিয়ে রাখা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র সত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের আত্মাহুতি এবং শুধু উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় এর দৃশ্যমান উদাহরণ।

আর একটি চাওয়া ছিল, বৈষম্যের অবসান। বাঙালি সম্প্রদায় যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করত, তাদের সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হতো। তাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক অন্যায় আচরণ, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা ইত্যাদির ফলে বাঙালিরা পাকিস্তানের অন্য নাগরিকদের তুলনায় নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করত।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা হিন্দুধর্মাবলম্বী ছিল, তাদের সাধারণ অন্যান্য বাঙালির তুলনায় অধিকতর বৈষম্যের শিকার হতে দেখা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা উপরিউক্ত সমস্যা সমাধানে প্রথমত দাবি উত্থাপন করে স্বায়ত্তশাসনের। অর্থাৎ নিজেরা নিজেদের শাসন করবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থেকে। এ প্রত্যাশা পূরণের সংগ্রাম শুরু হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সেই দাবি দমিয়ে রাখতে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করে। একপর্যায়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে স্বকীয়তা রক্ষা, বৈষম্যের অবসান এবং নানা ধরনের সামাজিক অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তির জন্য তাদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন; যার শাসন ও পরিচালন ভার নিতে হবে তাদের নিজেদের হাতে; এ ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। সে কারণে বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান ভূখণ্ডের পূর্ব পাকিস্তান অংশ আলাদা হয় এবং সেখানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে দেশটির নাম দেওয়া হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের শাসন করার অধিকারসহ একটি সার্বভৌম ভূমি, যেখানে বাঙালিরা নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা নিয়ে সব ধরনের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
প্রথমত, বাংলাদেশ হবে জনগণের দেশ এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত দেশ; অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত দেশ।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত; অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক দেশ।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় এ চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। কিছু নমুনা নিচে উদ্ধৃত করা হলো:

প্রস্তাবনা: তৃতীয় প্যারা
‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;’
প্রথম ভাগ: প্রজাতন্ত্র
১) বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে।

‘৭।(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে।’
বাংলাদেশ জনগণের দেশ; জনগণ সব ক্ষমতার মালিক; জনগণ নিজের দেশ নিজেরাই শাসন করবে। প্রায় ১৬ কোটি জনসমষ্টির সবার সরাসরি অংশগ্রহণে দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি পরিচালনা অবাস্তব। সে কারণে সংবিধান অনুযায়ী জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে দেবে।

এই প্রতিনিধিদের একটি অংশ তাদের হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্য অংশ জনগণের হয়ে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের ভুলত্রুটি তুলে ধরে শাসকদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করবে।

তারা বিভিন্নভাবে জনগণের মতামত তুলে ধরে শাসনকার্যে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। জনগণ এ প্রক্রিয়া শুধু সরকার গঠনে নয়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণে সক্ষম হবে।

এ পদ্ধতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য অবশ্যপালনীয় প্রথম শর্ত হলো, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন। এর পরপরই প্রয়োজন কার্যকর সংসদ; যার জন্য সেখানে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি অনস্বীকার্য।

গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রাধান্য লাভ করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন হয়; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণ হ্রাস পায়; মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

প্রতিদিন বাংলাদেশ পত্রিকার উপদেষ্টা, লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবুল কালাম আজাদ

আরো পড়ুন