প্রকৃতির সৌন্দর্যের মুগ্ধতার যাদুকরি শক্তি তারুয়া দ্বীপে

আকতারুজ্জামান সুজন, নিজস্ব প্রতিনিধি:

চারিদিকে জলরাশি পরিবেষ্টিত সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে পলি জমতে জমতে প্রায় ৪৬ বছর আগে ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে  বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচর ইউনিয়নের বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে  জেগে ওঠে তারুয়া দ্বীপ। এখানে একদিকে যেমন উপভোগ করা যায় সাগরের মাঝে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য, তেমনি দেখা মেলে নানা প্রজাতির গাছের সমারোহে গড়ে ওঠা সবুজ নিসর্গ আর হরেক রকম বন্য প্রানীরও। এছাড়া ও রয়েছে  নানা জাতের পাখিদের কল-কাকলি, বালুকাময় মরুপথ  আর সাগরের উত্তাল গর্জন সব মিলিয়ে পর্যটক আর ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে মুগ্ধতার বন্ধনে আবদ্ধ করার যেনো যাদুকরি শক্তি রয়েছে এই তারুয়া দ্বীপে ৷                                                                                                    
ভোরবেলায় তারুয়ার সমুদ্র সৈকতের পাড়ে দাড়ালে ভোরের সূর্য আপনাকে এমনভাবে আগমনী বার্তা দিবে, দেখে মনে হবে যেনো ভোরের সূর্য আপনাকে কাছ থেকে ইশারায় সুপ্রভাত জানিয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার আকাশে সিঁড়ি বেয়ে এক পা দুপা করে লাল রশ্মি ভরে ওঠার সেই অতুলনীয় দৃশ্যও দেখা মিলবে এই তারুয়া দ্বীপে।এছাড়াও রাতে নতুন শাড়িতে ঘোমটা পরা নব বধূর ন্যায় নিঝুমতায় ছেয়ে যায় পুরো তারুয়া দ্বীপ ৷ প্রকৃতির রূপ আলো আধারির বাহারী খেলার দেখা মেলে এখানে।তাই বলা যেতেই পারে পর্যটক আর ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে মুগ্ধতার বন্ধনে আটকে দেয়ার যাদু রয়েছে যেনো এই দ্বীপটিতে।
তবে সেখানে এখনো গড়ে ওঠেনি মানুষের বসতি। এখানে হরিণ ও ভাল্লুকসহ নানা প্রাণী ও দৃষ্টি নন্দন মাটি রয়েছে। সবুজ বৃক্ষের ঝঙ্কার আর পাখিদের কলরবে মুখরিত তারুয়া দ্বীপ।
শীতকালে তারুয়া দ্বীপের প্রকৃতি পেয়ে যায় যেনো তার নান্দনিক ছোঁয়া। বিচিত্র পাখ-পাখালির মধুময় কলতানে মুখরিত হয়ে উঠে এই দ্বীপটি জুড়ে। বছরজুড়ে এখানে  হরেকরকম পাখির কলোকাকলীতে সরব থাকলেও শীতে যেন নতুন প্রাণ পায় এখানকার পাখিরা। আবার এদের সঙ্গে যোগ হয়েছে সাইব্রেরিয়াসহ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দল। ইতিমধ্যে হাজারো প্রকৃতিপ্রেমীককে আকৃষ্ট করেছে তারুয়া দ্বীপের বিচিত্র বর্ণিল পাখিরা। দ্বীপের বালুতটে ছোট-বড় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি খেলা পর্যটকদের অন্যরকম আকর্ষণ করছে ৷ দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সৈকতজুড়ে লাল কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে ৷ বালুর ভেতরে লাল কাঁকড়ার বসতি, রোদ উঠলেই লাল কাঁকড়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকে।
 
তারুয়া দ্বীপটি এরই মধ্যে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। এ দ্বীপের সৌন্দর্যের কথা  বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ায় বিশেষকরে শীতের সময় শত শত মানুষ দলবেধে এখানে বেড়াতে আসছেন, আবার অনেকেই গ্রুপযুক্ত হয়ে দুই তিনদিনের জন্য  পিকনিক করতেও আসে ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম হাওলাদার বলেন, তারুয়া দ্বীপে পর্যটকদের জন্য  ব্যাক্তি মালিকানায়  তিন চারটি টিনসেট ঘর নির্মান করা হয়েছে, পর্যটকরা কম খরচে এই ঘর গুলোতে রাত্রিযাপন করতে পারবে, তাছাড়া অধিক সংখ্যক লোক হলে এখানে তাবু করেও থাকতে পারবে।  বিশুদ্ধ  পানির জন্য  রয়েছে একটি টিওবওয়েল তার পাশেই স্যানিটেশনের ব্যবস্থার জন্য রয়েছে স্যানিটারি লেট্রিন ও রাতের আধারকে আলোকিত করতে  সৌরবিদ্যুতের কয়েকটি লাইট  লাগানো হয়েছে। এছাড়াও পর্যটকদের জন্য রয়েছে দুলাল মিয়ার একটি দোকান, সেখানে যোগাযোগ করলে পর্যটকরা খাওয়ার ব্যাবস্থা থেকে শুরু করে  অন্যান্য সুবিধাও পাবেন।
এখানে বেড়াতে আসা পর্যটক মিজানুর রহমান, শাজাহান মামুন ও বিমল বলেন,  ‘তারুয়া দ্বীপের কথা আগে অনেকবার শুনেছি কিন্তু কখনোই দেখিনি। এখনে পিকনিক করতে এসে এবং জায়গাটি দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগেছে।                                                                                                পর্যটক হাবিব খান বলেন, ‘এখানে এলে বন ও সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখা যায় এক সঙ্গে। অন্য পর্যটন কেন্দ্রে একই সঙ্গে দু’টি সৌন্দর্য উপলদ্ধি করা যায়না।
গৃহিনী শারমিন আকতার বলেন,  টিনসেট ঘরের রুমে ভাড়ায় রাত্রি যাপন করার সুবিধা থাকায় আমি আশা করি আমাদের মত অনেকেই এখানে এই সুন্দর জায়গায় বেড়াতে আসবেন।
চরফ্যাশনের উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি -তদন্ত) মিলন কুমার  ঘোষ বলেন, পর্যটকদের জন্য  তারুয়া দ্বীপে নিরাপত্তা ব্যাবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও জলদস্যু দমনে সরকার ইতিমধ্যে  ঢালচর ইউনিয়নে একটি পুলিশ  ফাড়ি স্থাপন করেছে।
ঢালচর পুলিশ ফাড়ির  অফিসার ইনচার্জ আহম্মেদ আনোয়ার বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও ঢালচর পুলিশ ফাড়ির সমন্বয়ে এখানে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যাবস্থা রয়েছে, তবে  তারুয়া দ্বীপ ঢালচর ইউনিয়নের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় এবং অপ্রতুল নৌযান ও পুলিশ ফাড়ির নিজস্ব কোনো নৌযান না থাকার কারনে  অামরা পর্যাপ্ত কিংবা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার বিষয়টি  তারুয়া দ্বীপে আসা পর্যটকদের জন্য  এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি।
তারুয়া দ্বীপে যাওয়ার উপায় : ঢাকা থেকে লঞ্চে করে প্রথমে চরফ্যাশন বেতুয়া যেতে হবে। সেখান থেকে কচ্ছপিয়া পর্যন্ত সড়ক পথ হওয়ায় যাতায়াত সহজ। তারপর কচ্ছপিয়া থেকে স্পিডবোট  বা ইঞ্জিনচালিত  নৌকায় যেতে পারবেন সরাসরি তারুয়া দ্বীপে।
আরো পড়ুন