ভবদহ জলাবদ্ধতায় : যাতায়াতে বাঁশের সাঁকোই একমাত্র ভরসা

নিলয় ধর, যশোর প্রতিনিধি : ভবদহের জলাবদ্ধ নিরসনে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে এ অঞ্চলের প্রতিটি বাড়ি ও তার আশপাশের এলাকায় জমে আছে পানি। এ অবস্থায় ঘরের বাইরে আসতে তাদের একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো।
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর উপজেলা ও খুলনার ফুলতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। এ অঞ্চলটি বছরের প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ থাকে। এখনো তলিয়ে রয়েছে বাড়ি ও ফসলের মাঠ।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, পানি আগের তুললনায় সামান্য কমলেও বাড়ির উঠান থেকে এখনো নামেনি। এ অবস্থায় বাঁশের ওপর দিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘরে, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাতায়াত করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কথা হয় মণিরামপুর উপজেলার হাটগাছা গ্রামের মৃত সমীর বৈরাগীর স্ত্রী মাধুরী বৈরাগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৫ দিন আগে আমার বাড়ির উঠোনে মাজা পর্যন্ত জল ছিল, হঠাৎ আমার স্বামী স্ট্রোক করলো। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আমার কোনো নৌকা ছিল না। তাই প্রতিবেশির কাছ থেকে নৌকা ধার করে আনতে আনতে আমার স্বামী মারা গেল। এই কথা বলতে বলতে তিনি হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন।
তাপস মণ্ডল নামে একজন বললেন, ‘গত এক মাসের মধ্যে স্ট্রোকে মৃতবরণ করেন উপজেলার হাটগাছা গ্রামের বিরাট মণ্ডলের মেয়ে শিউলী মণ্ডল (৩২), দশারথ মণ্ডলের ছেলে সোমনাথ মণ্ডল (৩৫), প্রভাত মণ্ডলের ছেলে রণজিত মণ্ডল (৪০) ও হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মহানন্দ মণ্ডল (৫০)। রোগীদের বাড়ি থেকে দ্রুত বের করতে না পারায় তারা চিকিৎসা না পেয়েই মারা গেছেন।তাছাড়া রাস্তায় জলাবদ্ধতা ও রাস্তা খানা খন্দ থাকায় গুরুতর অসুস্থ  রুগীও সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারছে না।
তিনি আরো বলেন, ‘ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো আর নৌকা আমাদের ভরসা। আমার বাবাও অসুস্থ, কিন্তু তাকে চিকিৎসা করাতে বাইরে নিয়ে যাব, তার কোনো উপায় নেই। আমার বাড়ি থেকে পাকা রাস্তায় উঠতে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ জলাবদ্ধ। এ রাস্তায় তাকে ঘর থেকে বের করা দুরূহ।
মহিষদিয়া গ্রামের নিতাই মল্লিক বললেন, ‘সাঁকো ও নৌকা বানানোর টাকা আমার নেই। অনেক কষ্ট করে,কাট বাস এগুলো জোগাড়করে তৈরি করেছি।অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের শিক্ষক শিবপদ বিশ্বাস বললেন, নওয়াপাড়া-মশিয়াহাটী সড়কের সরখোলা, ডুমুরতলা, বেদভিটাসহ অসংখ্য রাস্তায় এখনো জল। অধিকাংশ স্কুলের মাঠ থেকে এখনো জল নামেনি। বাড়ির চারপাশে জল জমে থাকায় পানিবাহিত রোগসহ ঠান্ডাজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে। নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর মতো যেকোনো মুহূর্তে আমাদের জীবন ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। (টিআরএম) না হলে আমাদের দুঃখের শেষ হবে না।
হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি অনাথ বন্ধু বিশ্বাস বলেলেন, ‘ভবদহের জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, কিন্তু ভবদহ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সব লুটপাট হয়ে যায়।
এই ব্যাপারে মণিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখরচন্দ্র রায় বলেলেন, ৩ মাস ধরে মানুষ জলাবদ্ধ হযে থাকলেও সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা এই অঞ্চলের মানুষ পায়নি। বার বার যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।
মণিরামপুর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা এসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ বললেন, এ বছর জলাবদ্ধ অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারের তালিকা করা হয়নি। ফলে এখনো কোনো বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।
আরো পড়ুন