বেনাপোলের বিরিয়ানি হাউস গুলোতে চলছে ছাট ও পঁচা-বাঁশী মাংশের ব্যবহারে রমরমা অর্থ বাণিজ্য

শার্শা প্রতিনিধি: বেনাপোলে বিরিয়ানী হাউসগুলোতে মুখরোচক খাবারে ভাল মানের মাংশের বদলে ছাট ও বাঁশী মাংশ মিশিয়ে ভেজাল খাবার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

গতদিন তেহেরির মধ্যে মাংশের আদলে সয়াবিন ফল আকৃতির নরম তুলতুলে স্বাদবিহীন ছাট মাংশের তেহেরি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন বেনাপোল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক কামরুল ইসলাম। পরের দিন রেখে দেওয়া বাকি খাদ্য এসে আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউসে অভিযোগ করলে হোটেল মালিক তর্কের ডালি সাজিয়ে অপব্যাখ্যা করেন। বলেন ৫’শ টাকা করে গুরুর মাংস আর ৭’শ টাকা করে ছাগলের মাংশ কিনি। প্রতিদিন তার দোকানে কয়েক মন মাংশের প্রয়োজন হয়। পরে স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা এসে প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন গরুর মাথার কিছু মাংশ মেশানো হয়। যা ছাট মাংশ এবং খাওয়ার অনুপযোগী বলে অভিযোগ করেন কামরুল ইসলাম।

এনিয়ে বেনাপোলের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ অভিযোগ করলেও আমলে নেয়নি হোটেল মালিক আনিস ব্যাপারী।

তিনি বলেন, বেনাপোলের সকল বিরিয়ানির হোটেলে ছাট মাংশ মিশিয়ে বিরিয়ানী ও তেহেরী রান্না করা হয়। এক কেজি গরুর মাংশ ৭’শ টাকা। প্রতিদিন প্রত্যেক হোটেলে কয়েক মন করে মাংশ লাগে। তাতে বেশি একটা লাভ হয়না। এজন্য প্রতি কেজি মাংসে ২’শ টাকা বাঁচিয়ে কিছু মাথার মাংশ, জিহ্বাসহ কিছু ভেজাল দিতে হয়। আর এজন্য কসাইরা দায়ি বলে দাবি করেন এ হোটেল ব্যবসায়ী।

তবে স্থানীয়দের দাবি অনেক গরু বা ছাগল মৃত প্রায়, এমন সময় তা কসাইরা জবাই করে চামড়া ছাড়িয়ে মাংশের টুকরা করে এসকল হোটেলে অল্প টাকায় সরবরাহ করে থাকে এবং হোটেল মালিকরা তা সস্তায় পেয়ে লুফে নেয় এবং ফ্রীজজাত করে। সেসাথে এলাকার কিছু অসাধু মুরগি ব্যবসায়ীদের সাথে আতাত করে তারা অসুস্থ মুরগিগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে ফ্রীজজাত করে। পরে ধীরে ধীরে এসকল মাংশ দিয়ে সুস্বাদু খাবার-বিরিয়ানী ও তেহেরী তৈরি করে চড়া দামে বিক্রি করে থাকে। যা নিয়ে প্রশাসনের কোন নজরদারি না থাকায় এসকল হোটেল মালিকরা সদ্য কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনেগেছে।

এ বিষয়ে কথা হয় বেনাপোলের বিরিয়ানী ও তেহেরী পিপাসু কিছু মানুষের সাথে। বলেন, বাড়িতে অনেক সময় মহিলারা না থাকায় কেউ আর রান্না করার ঝামেলায় যেতে চায়না। অনেক সময় বাড়িতে মেহমান চলে আসে। তাই, রান্নার সকল ঝামেলা এড়িয়ে আভিজাত্য ঠিক রেখে এসকল হোটেল থেকে তেহেরীর প্যাকেট ১২০ টাকা, বিরিয়ানীর প্যাকেট ১৮০ টাকা দিয়ে কিনে দিব্যি বাড়িতে বসেই মেহমানদারিসহ নিজেরা খেতে পারি। তবে, মাঝে মধ্যে মাংশের ভিতর থেকে পঁচা দূর্গন্ধ পাওয়া যায়। আবার কখনও মাথার মাংশ, জিহবা, ভুড়ির অংশ বিশেষ পাওয়া যায়। যা নিয়ে অনেক সময় বিরক্তি বোধ হয়। অনেক সময় পঁচা গন্ধ বের হলে তা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। সময়ের অভাবে বা এদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত কিনতে হয় বলে কেউ এদের সাথে ঝামেলায় যেতে চায়না। বিশেষ করে এসকল হোটেল মালিকরা বহিরাগত হওয়ায় এরা স্থানীয় কিছু ক্ষমতাসীনদের সাথে সক্ষতা রেখে চলে এবং আইন প্রয়োগকারি সংস্থাদের সাথে অজ্ঞাতপন্থায় সন্তুষ্টির মাধ্যমে তাদের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পূর্বেও তারা বেনাপোলের বিভিন্ন অলিতে গলিতে ফুটপথে বসে তাদের আতুর ঘরের ব্যবসা পরিচালনা করলেও এখন তারা মেইন শহরের পরে লক্ষ লক্ষ টাকার পজিশন ক্রয় করে একেকজন কয়েকটি করে আলিশান হোটেলের ব্যবসা পরিচালনা করছে। কিভাবে সম্ভব?

কথা হয় বেনাপোল পৌরসভার স্যানিটারি ইনসপেক্টর রাশিদা খাতুনের সাথে। তিনি বলেন, আসলে এরা বিভিন্ন এলাকা থেকে বেনাপোলে এসে এখানে ছোট ছোট টেবিল চেয়ার পেতে বিরিয়ানী-তেহেরীর ব্যবসা করে বলে এদের দিকে তেমন একটা খেয়াল করা হয়নি। এখন দেখা যায় এদের একেকজন কয়েকটা হোটেলের মালিক। কিভাবে এরা এতোগুলো হোটেলের মালিক হলো তা খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিষয়ে বেনাপোল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, তিনি আল্লাহর দান বিরিয়ানী হাউসসহ বিভিন্ন বিরিয়ানী হাউস থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও নিজ প্রয়োজনে নিয়মিত তেহেরী ও বিরিয়ানী ক্রয় করেন। গতকাল সময় পেয়ে একটু তৃপ্তি সহকারে তেহেরী খাওয়ার সময় তার শরীরের মধ্যে ঝাড়া মেরে উঠে। সাথে সাথে তিনি মাংশের দিকে খেয়াল করতে থাকেন। বুঝতে ও দেখতে পায় তেহেরীতে খাওয়ার অনুপযোগী বাঁশী ও ছাট মাংস জাতীয় কিছু একটা মেশানো হয়েছে। যা দোকানদারকে নিয়ে দেখালে দোকানদার বলেন এগুলো অখাদ্য না, গরুর জিহ্বা। আমি বললাম আমিতো জিহবার মাংশ খাইনা, তাহলে আপনারা এগুলো সকলকে খাওয়ান কেনো। দোকানদার বলেন আমি একা না! সকল দোকানেই ছাট মাংশ দিয়ে রান্না করা তেহেরী ও বিনিয়ানী বিক্রি করা হয়। এসময় তিনি খাদ্যের দোকানদারদের প্রতি সরকারি দপ্তরের বিশেষ নজরদারি ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নাম প্রকাশে নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোল বাজারের কতিপয় কসাই জানান, গরুর মাংশের বাজার মূল্য প্রতিকেজি ৭’শ টাকা এবং খাশির মাংশ প্রতিকেজি ৯’শ টাকা হলেও এখানকার বিরিয়ানী হাউসের মালিকরা আলোচনা স্বাপেক্ষে সস্তায় মাংশ ক্রয় করে। গরুর মাংশ ৫’শ টাকা এবং ছাগলের মাংশ ৭’শ টাকা। যেকারণে পুঁজি ঠিক রেখে গরু ও ছাগলের ছাট মাংশ মাথা ও ভুড়ির কিছু অংশ মিলিয়ে তাদেরকে দেওয়া হয়। এছাড়া দিনের বিক্রি শেষে যে মাংশগুলো অবশিষ্ঠ থাকে তা তাদেরকে দেওয়া হয়। যা ফ্রিজে রেখে পরের দিন থেকে তারা তেহেরী ও বিরিয়ানি রান্না করে বিক্রি করে।

আরো পড়ুন