বিবর্তন যশোর কর্তৃক হরিজনপল্লীতে বিনামূল্যে টীকা রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত

স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোরঃ

হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথার বলির পাঠা হিসাবে খ্যাত দলিত সম্প্রদায়।সামাজিক বিভাজনের কারণে সৃষ্ট দলিত সম্প্রদায় একাবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক বিপ্লবী সমাজে আজও বিষবৃক্ষের ন্যায় বিরাট মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আজও সমাজের মূল স্রোতধারায় মিশতে পারেনি।ফলে তাদের জীবনযাপন অতিনিম্নমানের হয়ে থাকে।একজন মানুষ হিসাবে রাষ্ট্রের নিকট থেকে খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা,চিকিৎসা, চিত্তবিনোদনসহ সকল প্রকার মৌলিক
অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে।তাদের জীবনটা কাটে অন্ধকার যুগের মানুষের মতো কলোনির করিডরে।
সমাজে প্রচলিত জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদ প্রথার জন্য দেশের সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা হয়ে গেছে দলিত সম্প্রদায়। শুধু সামাজিক কারণে গড়ে উঠা জাতিভেদ প্রথা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছেন। ফলে সামাজিক বর্ণপ্রথার যাতাকল রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করায় সমাজে তাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। জাতিভেদাভেদের এই কালো অধ্যায় ইতিহাসের পাতায় দলিত সম্প্রদায়ের চোখের জলের বন্যায় পদ্মা,মেঘনা,যমুনার ফল্গুধারার ন্যায় প্রবাহিত হয়ে যাবে।

সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা গান্ধী দলিতদের মেথর, সুইপার না বলে হরিজন বলার অমোঘ বাণী শুনিয়ে গেলেও সমাজ ও সামাজিকতার স্বীকৃতি দিয়ে যায়নি বলে তারা সমাজের মূলস্রোতধারার সাথে আজও নিজদের অভিযোজিত করে নিতে পারেনি। ফলে দলিতকে মেথর বা সুইপার না বলে হরিজন বলার প্রচলনটা আমাদের সমাজে আজও সোনার হরিণের ন্যায় অধরাই থেকে গেছে।
আর তাই আজও সারাদেশে দোকানে চা,পানি ও খাবার খেতে গেলে আলাদা গ্লাস ও প্লেট নিয়ে যেতে হয় এবং দোকানের বাইরের কোন এক জায়গায় বসে খাবারটা খেয়ে নিতে হয়।এছাড়াও দক্ষিণ বঙ্গ ও উত্তর বঙ্গে সুইপাররা কোন বাড়ি খাবার খেতে গেলে কলাপাতায় খেতে দেওয়া হয়।

সুইপার বা হরিজন সম্প্রদায় সম্পর্কে সমাজের এধরণের অবস্থান পরিবর্তন অতি জরুরি। আর তা না হলে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী যারা আমাদের আশেপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখে তাদের এই অবদানকে শুধু অস্বীকার করাই হবে না বরং একটা পেশাকে অসম্মান করা হবে।আর তাই তাদের সমাজের মূলস্রোতধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহন করা অতীব জরুরি। তারা যদি রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা না পায় তাহলে সরকারের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন অনেকাংশে অপূর্ণ থেকে যাবে।

নাটক জীবনের কথা বলে, নাটক সমাজের বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অসঙ্গতি পরিবর্তনের কথা বলে। আর তাই সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বিবর্তন যশোরের নাট্যকর্মীরা করোনার এই ক্রান্তিকালে যশোরের রেলস্টেশন এলাকায় গড়ে উঠা সুইপার কলোনিতে বসবাসরত পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার সর্বাপেক্ষা বড় হাতিয়ার টীকা নেওয়ার জন্য বিনামূল্যে টীকা নিবন্ধনের কাজ আজ ৩ আগষ্ট-২০২১ রোজ মঙ্গলবার বিকাল থেকে অনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন।তারা আজ অর্ধশতাধিক হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষকে টীকার আওতায় আনার জন্যে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত করেছেন। বিবর্তন যশোরের এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে।

উল্লেখ্য ১৫ দিন পূর্বেই বিবর্তন যশোরের কর্মীরা বিনামূল্যে টীকা রেজিষ্ট্রেশনের কাজ নিজস্ব কার্যালয় থেকে শুরু করে চাঁচড়ার রূপদিয়া বিলপাড়া মোড় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন এবং আগামীকাল সকাল ১১ ঘটিকায় আরও একটি অনাগ্রসর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল যশোর শহরের বেজপাড়া মেইন রোডস্থ বুনোপাড়ায় বিনামূল্যে করোনা টীকার রেজিস্ট্রেন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এছাড়া বিবর্তন যশোর গতবছর করোনা মহামারীর শুরু থেকে সামাজিক সচেতনতা, মাস্ক ও স্যানিটাইজার, খাদ্য ও শিশু বস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন মূলক কাজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন এবং ২০২১ সালের ২৮ জুন থেকে যখন যশোরের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দিয়েছিল তখন করোনা আক্রান্ত রোগীদের বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করে যশোর শহরের বুকে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

আরো পড়ুন