ধীরগতিতে ঝুলে আছে হত্যা মামলা

নিজস্ব প্রতিনিধি: ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফেনীর দায়রা জজ আদালতের রায়ে স্বস্তিতে সরকার, আইনজীবী ও দেশের সর্বস্তরের মানুষ। প্রশংসিত এ রায় হয়েছে ব্যাপক আলোচিত, বিশ্ব দরবারে কুড়াচ্ছে সুনাম। যদিও এ রায়ের পরই নুসরাত হত্যার পূর্বাপর অসংখ্য চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বাদিরা বলছেন, নিম্ন আদালতের এ রায়ে উচ্ছসিত নন তারা। ১৪ কার্যদিবসে নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার কার্যক্রম যেখানে দুই বছর ধরে ঝুলে রয়েছে— উচ্চ আদালতে শুনানি হয়নি আদৌ; সেখানে এমন রায়ে আস্থা রাখতে পারছেন না তারা।

আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ ঘটনায় দেখা গেছে, নিম্ন আদালতে রায় দেয়ার পরও উচ্চ আদালতে থমকে দাঁড়াচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়া। যেমনটা ঘটেছে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে রুপা ধর্ষণের পর হত্যা মামলায়ও। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের পর এমনটাই বলছেন রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান। নানা জঠিলতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনীহায় একেকটি মামলা দিনের পর দিন গড়াচ্ছে আদালতে।

তার মধ্যে তনু হত্যা মামলায় তদন্তও থমকে দাঁড়িয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার গড়িমসিতে। যে কারণে আদৌ শুরুই হয়নি বিচারিক প্রক্রিয়া। তনুর মা-ও বলছেন, নুসরাত হত্যা মামলার রায় অল্প সময়ে দেয়া প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তনু হত্যার তদন্ত কেন থমকে রয়েছে এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি সরকারের প্রতি। তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকেও দায়ী করছেন এ জন্য।

এছাড়া খোদ আদালতেই বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিচারিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। বাস্তবতার এমন পর্যায়ে যখন উত্তীর্ণ বিচারব্যবস্থা, ঠিক সে সময়ে নুসরাত হত্যায় যুগান্তকারী রায় এসেছে বলছেন অনেকেই। বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় ১৬ আসামির ফাঁসির দণ্ডে ফের সাড়া ফেলেছে।

এদিকে চলতি বছরের এপ্রিলে নরসিংদীতে শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হওয়ার প্রায় ৪০ দিন পর না ফেরার দেশে চলে গেছেন গৃহবধূ জান্নাতি আক্তার (১৮)। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে যৌতুকের জন্য ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হন গৃহবধূ জান্নাতি। পরিবারের পক্ষে অগ্নিদগ্ধের ঘটনায় আদালতে একটি মামলা করা হলেও আদৌ জান্নাতির পরিবার পায়নি বিচার।

এদিকে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ শরীয়তপুরের জাজিরা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী চাঁদনী আক্তার হেনাকে (১৩) অপহণের পর ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তিনদিন পর বাড়ির অদূরে শুকনো খাল থেকে চাঁদনীর মরদেহ পাওয়া গেলে ১৩ মার্চ চাঁদনীর বাবা আলী আজগর খান প্রথমে জাজিরা থানায় অজ্ঞাত মামলা এবং পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার কয়েকদিন পর ওই এলাকা থেকে সন্দেহভাজন হেনার বান্ধবী পাখি আক্তারসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।

২০১৮ সালে একটি দায়সারা অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে এজহারভুক্ত প্রধান আসামী মিলন মাদবর সহ অনেকের নাম বাদ দেয়া হয়। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ কাজ করা হয়েছে।চার্জশিট দেয়ার কিছুদিন পর ওই মামলার বাদি ও চাঁদনীর বাবা আলী আজগর খান মারা গেলে মামলায় স্থবিরতা নেমে আসে। হত্যাকাণ্ডের এত বছর পরও বিচারকাজে অগ্রগতি হয়নি। এমনি আটককৃত কেউ আর কারাগারে নেই। সবাই জামিনে বেরিয়ে এসেছে।

ফেনীর নুসরাত হত্যার বিচারের রায় শুনে শরীয়তপুরের জাজিরার মানুষের মনে চাঁদনী হত্যার বিচারের বিষয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। ফেনীর নুসরাত হত্যার রায় বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নারী নির্যাতন দমন চাঁদনী মঞ্চের সদস্য সচিব মো. পলাশ খান আমার সংবাদকে বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের রায় একটি ঐতিহাসিক রায়।

এর মধ্যদিয়ে মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার ওপর আরো আস্থা ফিরে এসেছে। আমরা আশা করি, শরীয়তপুরের জাজিরায় ২০১৫ সালে সংগঠিত চাঁদনী আক্তার হেনা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম হবে। দ্রুত চাঁদনী হত্যার রায়ও আমারা পাবো। সেদিন চাঁদনী হত্যার চায় এত দ্রুত সময়ে দেয়া হলে অপরাধীরা সেখান থেকে শিক্ষা নিতো, তাহলে হয়তো নুসরাতকে প্রাণ হারাতে হতো না।

এ ছাড়া টাঙ্গাইলে চলতি বাসে রুপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে বাসের চালক এবং সহকারীসহ চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। এ মামলায় একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরও আগে অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষী ও যুক্তিতর্কের জন্য মাত্র ১৪ দিন সময় নেয়া হয়।

কিন্তু গতকাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় শোনার পর রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ১৪ কার্যদিবসে নিম্ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও হাইকোর্টে ঝুলে আছে আদৌ।’ শুনানিই হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন উচ্চ আদালতের কর্মপরিধি নিয়ে। ‘উচ্চ আদালত আসলে কী করে? এছাড়া নিম্ন আদালতের রায়েই এত আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ড. এলিনা খান বলেন, আমিও উদ্বিগ্ন। নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে কথাটি বলাই আছে— ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। যেটা বাংলাদেশে কখনোই হয় না, যদি না স্পেশাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেখানে স্পেশাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও দুঃখজনকভাবে উচ্চ আদালতে অসংখ্য মামলা ঝুলে আছে। আমি মনে করি, নারী শিশু নির্যাতনের এমন মামলাগুলো পরিচালনার জন্য একটি স্পেশাল কোর্ট হওয়া উচিত। যে কোর্টগুলোতে এ ধরনের মামলার সকল প্রক্রিয়া খুব দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা হবে এবং মামলাগুলোর শুনানি দ্রুত শেষ করতে হবে।

আমিও বলি, শুধু প্রাথমিক সন্তোষেই সন্তুষ্ট না, হাইকোর্টে মামলাগুলো যেন খুব কম সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে নিষ্পত্তি হয়, সে ব্যবস্থা যাতে গ্রহণ করা হয়।

আরো পড়ুন