দেবদূতের আর্বিভাব-

স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর:-

বৈশ্বিক মহামারী করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে সীমান্তবর্তী যশোর জেলাসহ সমগ্র দেশের মানুষ আজ ক্ষতবিক্ষত ও রোগাক্রান্ত । প্রতিদিন গাণিতিক হারে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। মৃত্যুর এই মহা মিছিলে যুক্ত হয়েছে বাবা-মা,ভাই-বোন,স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধবসহ জানা আজানা কত আপনজন।মৃত্যুর মহাভারে সারা বিশ্বের ন্যায় প্রাণের শহর যশোরসহ সমগ্র দেশ আজ বড় ক্লান্ত, উদভ্রান্ত।প্রতিদিন মৃত্যুর এই মহা দৈব্যরথের ভারে ও অতি সংক্রমণব্যাধি করোনার ভয়ে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে থাকতে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে বিষাদ গ্রস্থ।
প্রিয় মাতৃভূমির প্রাণের শহর যশোরসহ ৬৪ টি জেলার ৫৩ টি জেলাই আজ করোনার বিষে জর্জরিত হয়ে নীলকন্ঠ হতে চলছে।প্রতিদিন শত শত মৃত্যু সংবাদ ও হাজারে হাজারে করোনায় আক্রান্তের ভারে ধারিত্রী আজ মহাপ্রলয়ের দিকে ধাবিত হতে চলছে।

মহা প্রলয় থেকে দেশ ও দেশের জনগণকে রক্ষা করতে সরকার ঘোষিত নামে বেনামের লকডাউনের ভারে সাধারণ ঘেটে খাওয়া মানুষের জীবনে নাভিঃশ্বাস। তাদের ঘরে না আছে খাবার, পরণে না আছে কাপড় কিন্তু করোনার সংক্রমণ থেকে দেশকে, দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য শত দুঃখকষ্ট নিরবে মেনে নিয়েছে।কিন্তু তারপরেও তো প্রতিদিন শুনতে হচ্ছে নতুন নতুন মৃত্যু সংবাদ ও আশেপাশের আপনজনের করোনায় আক্রান্তের সংবাদ।

একদিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত মানুষের সংখ্যাধ্যিকের কারণে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে ও চিতা জ্বলাতে মানুষ আজ বড় ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। অন্যদিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বা বাড়িতে জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের অভাবে ও খাদ্যের অভাবে হাহাকার করছে তাদের খোঁজখবর ক’জনই বা নিচ্ছে এই সমাজের তথাকথিত সভ্য মানুষেরা?

তাদের সংখ্যা নিতান্তই সামান্য । কিন্তু যুগে যুগে দেখা যায় কিছু মানুষ দেবদূত হয়ে আর্বিভূত হয় বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতে। এরা শুধু বন্যা, ঝড়,জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা নয়,ইদ বা পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে, শিশুদের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দিতে,শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণের জন্য গরম পোশাক বিতরণ করতে,ইদ বা পূজার সময়গরীব অসহায় মানুষদের হাতে দুমুঠো ভালমানের খাদ্য তুলে দেওয়াসহ যেকোনো দুঃসময়ে এই মানুষগুলো সীমিত সামর্থ নিয়ে মহাকাশের ন্যায় বিশাল মন নিয়ে হাজির হয়। বিশাল পরিসরে না পারলেও ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও মানুষের সেবায় নিজেদের নিবেদন করে।

ছাত্র মৈত্রীর সাবেক নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী যারা এক সময় ধনীগরীবের বৈষম্য দূর করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নিজেদের জীবনের সাথে আপামোর সকলের জীবনকে রাঙিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে স্বপ্ন পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করতে না পারলেও চেষ্টার কোন কমতি রাখেনি এবং যখনই কোন সুযোগ পেয়েছে তখনই আবার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজেদের উজাড় করে দেওয়া চেষ্টা করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় করোনার শুরুতেই বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় খাদ্য সহায়তা, শিশুদের পোষাক প্রদান করেছে ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সংগঠন মৈত্রী মানবিক সহায়তা কমিটি। এবার প্রাণপ্রিয় শহরের মানুষদের জীবন রক্ষা করতে বীর সেনানীরা সাহসের সাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। করোনার এই ক্রান্তিকালে যখন মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তখন যশোর জেলার কিছু অকুতোভয়,দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সচেতন,মানব হিতাঙ্খী মানুষ সীমিত সামর্থ নিয়ে মনের জোরে করোনার সংক্রমণে সংক্রমিত লোকদের সেবায় নিয়োজিত করার চেষ্টা করেছে এবং অক্সিজেন সংকটে ভোগা রোগীদের বাড়ি থেকে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ফোন করলে জাতিধর্ম,বর্ণ,গোত্র বা দল বিবেচনা না করে অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে রাতদিন ছুটে চলছে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।

মানুষের জন্য ছুটে চলা এই মানুষ গুলোর অনেকেই এই মুহূর্তে নিজে ও পরিবারসহ করোনায় আক্রান্ত। আবার কেউবা ইতিপূর্বেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং পুনরায় নিজেদের নিবেদিত করেছে মানুষের সেবায় ও করোনায় আক্রান্ত মানুষের শ্বাসকষ্ট নিবারণের জন্য গোটা বিশেক সিলিন্ডার নিয়ে মাঠে নেমেছে মৈত্রী ভলেন্টিয়াররা। সিলিন্ডারগুলো যশোর শহরের বিভিন্ন অলিতে-গলিতে করোনা আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের চাহিবা মাত্র বাহকে দিতে বাধ্য থাকবে- এর ন্যায় নিজেরাই পৌঁছে দেওয়াসহ রোগীর শরীরে সেটিংয়ের কাজটাও করে দিচ্ছেন।
যেখানে রোগীর আপন লোকেরা সংক্রমণের ভয়ে কাছে যাচ্ছে না সেখানে এই ভলান্টিয়ারা নির্দ্বিধায় সেই রোগীর অক্সিজেন লেভেলটা চেকিং ও অক্সিজেন সেটিংয়ের কাজটা করছে সম্মূখ সারীর এই যোদ্ধারা।

শুধু মৈত্রী ভলেন্টিয়াররা নয় তাদের সমমনা নাট্যগোষ্ঠী বিবর্তন যশোরের কর্মী,সংগঠকরাও করোনার এই দুঃসময়ে সম্মূখ সারীর যোদ্ধা হিসাবে হতদরিদ্র মানুষদের কয়েক লক্ষাধিক টাকার খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছেন এবং ডজন খানেক অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রাতদিন ছুটে চলেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের অক্সিজেনের লেভেল চেকিং ও অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহসহ সেটিং এর কাজ করতে।

এছাড়া আরএন রোডের আরও একটি গ্রুপ জাতির এই ক্রান্তিকালে কয়েক লক্ষাধিক টাকার খাদ্য সহায়তা দিয়ে এবং গোটা দশেক অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা করছে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় নিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা হয়ে দ্বিকবিদিক ছোটাছুটি করছে। কার কখন কি হয়, কখন যে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয় এই চিন্তায় যখম মত্ত ঠিক তখনই একটি অসাধু ব্যবসায়ী মহল নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, ওষুধের দাম বৃদ্ধি এমনকি জীবনদায়ী অক্সিজেনের সিলিন্ডার, অক্সিমিটারসহ অক্সিজেনের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত তখন মৈত্রী মানবিক সহায়ক কমিটি,বিবর্তন,যশোরসহ আরএনরোডের এইগ্রুপ খাদ্য সহায়তা ও অক্সিজেন নিয়ে দিনরাত মুমূর্ষু রোগীদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে একাবিংশ শতাব্দীর স্বর্গরাজ ইন্দ্রসম দেবদূতেরা।
কোথায় স্বর্গ বা বেহেশত , কোথায় নরক বা দোজখ তা আমরা হয়তো চোখে দেখতে পাব কিনা জানি না তবে করোনা মহামারীর সময় কাজ হারানো মানুষের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য ও করোনায় আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের শ্বাসকষ্ট নিবরণের জন্য

আরো পড়ুন