জলাবদ্ধ হয়ে আগাছায় ভরে আছে ভবদহের ২১ টি বিল-

স্বীকৃতি বিশ্বাসঃ

গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন সারাদেশের মাঠঘাট ফেটে চৌচির,নদ-নদী খাল-বিল পানি শূন্যতায় ভুগছে,
ভরা বৈশাখে রৌদ্রের দহনে ধরনী ও ধরনীর মানুষ যখন দিশেহারা,সমগ্র বাংলাদেশের কৃষক তাদের উৎপাদিত স্বপ্নের ফসল বোরোধান ঘরে তোলার কাজে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেনতখন ভবদহ এলাকার হাজার-হাজার কৃষক অনাবাদি বিলের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে বসে আছে।আজ যখন সারাদেশের কৃষক যখন মনের আনন্দে তাদের উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত তখন তারা অনাবাদি বিলগুলির দিকে চেয়ে চেয়ে চোখের জল ফেলছে।কারণ গত কয়েক বছর কৃষকের ঘরে কোন নতুন ফসল ফলেনি কিন্তু এবছর অনেক স্বপ্ন নিয়ে দেশের সরকার,স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি-এর ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পরিচালিত সেচ প্রকল্পের দিকে চেয়েছিল। কিন্তু আশায় গুড়ে বালি ঢেলে ভবদহ এলাকার হাতে গুণা কয়েক বিলে ফসল উৎপাদিত হলে ২৭ টি বিলের মধ্যে ২১ বিলের অনাধিক ৪০ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচেয় তলিয়ে আছে।

বিলগুলি হলো-বিল কেদারিয়া, বিল গান্ধী মারী, চাতরার বিল, নুনের বিল, বিল ঝিকরা, ধলের বিল,ডুমুরের বিল, শালিখার বিল,ফাহালের বিল, ভায়নার বিল,মাঠের ডাঙার বিল, বিল পায়রা, বিল কপালিয়া,আড়পাতার বিলের ৩০ হাজার হেক্টর জমি ও কেশবপুর উপজেলার বক উড়ার বিল,বাগডাঙার বিল, ভাটবিলার বিল, নড়ের বিল, জিয়লদহের বিল, বিল খুকশিয়া, বিল ভায়নাসহ অনেকগুলি কুড় বিলের ১০ হাজার হেক্টর জমি।বিলগুলি অধিকাংশ মনিরামপুর,অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার অবস্থিত।

উল্লেখ যশোর সদর, মনিরামপুর,অভয়নগর, কেশবপুর ও খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার এই ২৭ টি বিল মুক্তেশ্বরী, টেকা,হরি,আপারভদ্রা,হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদী দ্বারা বেষ্টিত।এই অঞ্চলের বৃষ্টির ও উজানের পানি উপরে উল্লেখিত নদী ও বিলের সাথে সংযুক্ত খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হতো।
কিন্তু সমুদ্রের লবণাত্মক পানি যাতে জোয়ারের সময় বিলগুলিতে প্রবেশ করতে না পারে এবং কৃষিযোগ্য চাষের পানি ধরে রাখার জন্য ষাটের দশকে অভয়নগরের সীমান্তবর্তী ভবদহ নামক স্থানে হরি ও টেকা নদীর উপরে ২১, ০৯ ও ০৬ ভেন্ট স্লুইসগেট তৈরি করা হয়। ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত এই স্লুইজগেটের সুবিধা পাওয়া যায়।

মুক্তেশ্বরী- টেকা- হরি-আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদী গুলোর মূল উৎস পদ্মা। এই নদীগুলোর পানির মূল উৎস পদ্মার পানি প্রবাহে বাঁধার সৃষ্টি হওয়ায় উজানের পানিতে আসা পলি নদী ও খালের তলদেশে পড়ে ভরাট হতে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে পলির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় খুব দ্রুত সময়ের মধ্য নদীও খালগুলি ভরাট হতে হতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
আর এই জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিত ও কল্পনা প্রসূত কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যার ফলাফল শূন্য।
এবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে অলীক সেচ প্রকল্প নিয়ে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বিএডিসি)। ষাট লক্ষ টাকা খরচ করে ১৩ টি সেচ পাম্পের মাধ্যমে ভবদহ এলাকার ২৭ টি বিলের পানি অপসরণের অপচেষ্টা। এই সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা গেল কিছুদিন চলার পর নদীতে পানি না থাকায় বন্ধ রাখা,পর্যাপ্ত লোকবল,বিদ্যুৎ সরবরাহসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা।
ফলাফল ২৭ টি বিলের কয়েকটি বিলের উঁচু জমিতে বোরোধান উৎপন্ন করা গেলেও বাকি ২১ বিলের জল অপসরণ না হওয়ায় স্থায়ীভাবে এখন জলাবদ্ধতায় মগ্ন।
বিলগুলির উঁচু অংশের পানি কমলেও অধিকাংশ বিলের জমিগুলিতে কোমর সমান পানি।আর বিলগুলিতে এখন নৌকা চলছে।আর বিলের জমিতে শাপলা-শালুকসহ নানারকম আগাছা জঙ্গলে ভরে আছে। যেহেতু বিলগুলি জলাবদ্ধ তাই আগামী বর্ষাকালে যে আবারও স্থায়ী জলাবদ্ধতার বিভৎস্যরূপ নিবে এই চিন্তায় ভবদহ এলাকার জনগণ চিন্তিত ও শঙ্কিত।
ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রথমে দরকার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রকল্পের বাইরে রেখে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী দিয়ে নদনদী,খালবিল গুলি খনন,অব্যাহতভাবে নদী ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, পর্যায়ক্রমে ২৭ টি বিলে পরিক্ষিত টিআরএম( টাইডার রিভার্স ম্যানেজমন্ট) চালু রাখা এবং পার্শ্ববর্তী নওয়াপাড়ার ভৈরব নদ খনন করে আমডাঙ্গা খালের সাথে সংযুক্ত করা।

অন্যদিকে এই বিলগুলির কিছু বিলে ব্যক্তি মালিকানায় মাছের চাষ হচ্ছে।আর মাছ চাষ করে জমির মালিকদের যত সামান্য টাকা দিয়ে ব্যক্তি বিশেষ লাভবান হচ্ছে।ফলে জোঁক গল্পের ন্যায় এখানেও অত্র এলাকার কৃষকদের রক্ত চোষার ন্যায় শোষণ করা হচ্ছে ।শুধু শোষণ করেই ক্ষান্ত নেই অনেক সময় কৃষকের পাওনা টাকাটাও ঠিক মতো দেয় না।এমনকি চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও ঐসব মালিকেরা তাদের বিলের জমি ছেড়ে দিতে তালবাহানা করে এবং গ্রামের সাধারণ কৃষকদের হুমকি ধামকি দেয়।যা দেখার জন্য স্থানীয় জনপ্রশাসন থাকলেও টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়।অনেক সময় দেখা যায় এই সব মৎস্য ব্যবসায়ীরাও তাদের মাছ চাষের সুবিধার্থে চায় না বিলগুলি জলাবদ্ধতা মুক্ত হোক।আর তাই তারা স্থায়ী সমাধানের জন্য এলাকার সাধারণ মানুষের প্রস্তাবিত সুনির্দিষ্ট কোন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি প্রশাসনকে কব্জা করে নেয়।

যদি কৃষকদের নিয়ে সমবায় সমিতি গঠন করা যায় এবং সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মৎস্য চাষের উপর কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সরকারি ঋণদিয়ে মৎস্যচাষে উদ্ধুদ্ধ করা যায় তাহলেও সাধারণ কৃষকের কিছুটা হলেও উপকার হতো এবং রক্তচোষাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারতো।

আরো পড়ুন