গৃহবন্দীর জবানবন্দী ৫২তম পর্বে শহিদ মাহমুদউল্লাহ কন্ট্রাক্টর’র জীবনী

বিশেষ প্রতিনিধি

দুলাল স্যার নিয়মিত কলাম গৃহবন্দীর জবানবন্দী ৫২তম পর্বে শহিদ মাহমুদউল্লাহ কন্ট্রাক্টর’র জীবনী ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাস পর্যন্ত চরফ্যাসন অনেকটাই ক্ষমতাসীস জামায়াতে ইসলামী ,নেজামে ইসলামী , মুসলীম লীগ পরিচালিত শান্তি কমিটি রাজাকার আলবদরের দখলে ছিল। সেপ্টেম্বর মাস থেকে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা গেলিলা পদ্ধতিতে পরিস্হিতি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে ।বিভিন্ন ইউনিয়নে গঠিত সংগ্রাম কমিটির ভূমিকা ছিল খুবই তাৎপর্য পূর্ণ ।

এপ্রিল মাসেই ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় । দুলার হাট এলাকায় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জালাল আহাম্মদ মাস্টার পিতা ,জব্বর আলী মাঝি সাং চর যমুনা , এবং সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টর পিতা আবদুস ছোবহান মাতাব্বর সাং চর তোফাজ্জল ।ওচমানগন্জ ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি আবদুল লতিফ মিয়া হাজী আমিন মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ মোশারেফ হোসেন মিয়া পিতা আজাহার উদ্দিন মিয়া। আমিনাবাদ ইউনিয়নে সিভিল কমিটির সভাপতি ছিলেন আবদুস সালাম মাঝি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আ: হাকাম মিয়া । আবদুর রব মিয়া সভাপতি ,ফজলুল করিম মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে আছলাম পুর ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় ।মো: মোস্তফা মিয়াকে সভাপতি এবং আ: ছোবহানকে সাধারণ সম্পাদক করে জিন্নাগড় ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় । আ: পনি চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে এবং মোহাম্মদ আলী আখন কে সাধারন সম্পাদক করে হাজারী গন্জ ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় ।মোখলেছুর রহমান পন্ডিত কে সভাপতি এবং আবদুস সাত্তারকে সাধারন সম্পাদক করে চর মানিকা ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় ।মো: ইদ্রিস মাষ্টারকে সভাপতি এবং হাসানুজ্জামান মালতিয়াকে সাধারন সম্পাদক করে চর মাদ্রাজ ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় ।

প্রথম পর্যায়ে নকশাল পন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ।।নকশাল গ্রুপের বাহিরে স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন কৌশলে অস্ত্র সংগ্রহে ব্যস্ত ।অনেকে ইন্ডিয়া প্রশিক্ষনে চলে গেছেন ।অনেকে এলাকার বাহিরে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন । নকশাশ গ্রুপের নেতৃত্বে ৩০ আগষ্ট ওয়ালিউ ল্লাহ মিয়া গুলীতে আহত হওয়ার পর পরিস্হিতি থমথমে ।এই ঘটনায় ক্ষমতাশীন দলের মহকুমা কমান্ডের টনক নড়েছে ।তাদের পাল্টা প্রতিশোধের আতংকে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যেতে শুরু করেন । ওয়ালিউল্লাহ মিয়া তখন তার চরফ্যাসন রাজনৈতিক বাসভবনে চিকিৎসারত । সবাই তাঁর সাথে সহানুভূতি প্রদর্শনের সামাজিকতায় দেখা করেন ।আওয়ামীলীগ সমর্থিত নেতা কর্মীদের পক্ষ থেকেও সামাজিকতা রক্ষার নামে অনেকে ফল ফ্রুট্স নিয়ে দেখা করতে বাধ্য হন । গুজব ছড়াতে থাকে দুলার হাট মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টরের বাসায় মিটিং করে আমিনাবাদ থেকে এসে এই গুলী করা হয়েছে । কাজেই আমিনাবাদ পুড়িয়ে দেয়া হবে। আমিনাবাদের ফজলুর রহমান মাস্টারের (পরবর্তী সময় এমপি)সহধর্মিনী ওয়ালিউলাহ মিয়ার সাথে দেখা করে প্রতিবাদ করেছেন।আমিনাবাদের মানুষ আপনাকে গুলী করেনি। প্রকৃত অপরাধীর বিচার হোক। কিন্তু সাধারন মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়  সেদিন থেকে আমিনাবাদের বিভিন্ন বাড়ী ঘরের মানুষ এলাকার বাহিরে দক্ষিনান্চলে আত্মীয় স্বজনের বাড়ী চলে যেতে থাকে ।ঘরের চালা ছাড়া অন্য সব মালামাল পুকুরে কিংবা বাগানের ঝোপের মধ্যে কিংবা বাগানে গর্ত করে রাখা হয় । আমাদের বাড়ীর প্রত্যেক পরিবারের এই দৃশ্য আমার স্বচক্ষে দেখা। আমার দাদা ইয়াকুব আলী মাঝি এসময় আমিনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চার্জ চেয়ারম্যান। কারন ছিল ,চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান হাওলাদার গফুর হাওলাদারদের একটি মিথ্যা হত্যা মামলার আসামী হিসেবে জেলে ছিলেন । আমার দাদার ঘরে তখন কয়েকটি হিন্দু পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন ।যতটুকু মনে পড়ে , আশ্রয় গ্রহনকারী পরিবারের মধ্যে উপজেলা পরিষদের নৈশ প্রহরী মহেশদের পরিবারটিও ছিল । আমাদের বাড়ীর লোকজন যখন বাড়ী ছেড়ে পালায় ,তখন তাদেরকেও অন্য কোথাও চলে যেতে বলা হয়েছে । ৩ সেপ্টম্বর পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের নোয়াখালীর নকশাশ পন্থী মুক্তি যোদ্ধাদের হাতে দুলার হাট দূই রাজকারের মৃত্যু , ৩০ আগষ্ট মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টরের বাসায় সভা , শান্তি কমিটির সেক্রেটারী ওয়ালীউল্লাহ মিয়াকে কে গুলী ।সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে ৬ সেপ্টেম্বর দুলার হাটের মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টর , জালাল আহাম্মদ মাষ্টার , আজিজল হক বেপারী , নাসির মিয়াকে গ্রেফতার করে ভোলা সদরে নিয়ে টর্চার করা হয় । তাদের মুক্তির জন্য ভোলা সদরে অনেক তদবীর , দেন দরবার করা হয় । কিন্তু কোন প্রকার ফল পাওয়া যায়নি । এর মধ্যে ৯ সেপ্টেম্বর পেয়ার আলী বেপারী ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে চরফ্যাসন রাজাকারের ডেপুটি কমান্ডার বেলায়েত সহ আটজন রাজাকার মারা যায় । সবমিলিয়ে গ্রেফতার কৃত দুলারহাটের চার মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করা যায়নি । ১১ সেপ্টেম্বর ভোলা খেয়াঘাটে তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় ।তাদের লাশ আত্মীয় স্বজন আর খুঁজে পায়নি ।

প্রকাশ: ২৬/৫/২০২০ বিদ্র :শহীদ মুক্তিযুদ্ধা মোহাম্মদ উল্লাহ কন্ট্রাক্টরের ছবি এবং শহীদ মুক্তিযুদ্ধাদের স্মরণে দুলারহাটে স্থাপিত স্মৃতিফলক এই পর্বে সংযোজিত হলো।

আরো পড়ুন