করোনা, এবার করুণা কর তুমি

শিবলী আল সাদিক

ধীরে ধীরে অনেকটা দিন চলে গেল। এখনো ঘরবন্দি কর্মহীন মানুষ গুলো করোনা থেকে মুক্তির প্রকৃত দিশা খুজে পায়নি।

এই অবস্থায় দরজায় এসে কড়া নাড়লো রমজানের রোজা। রমজানের পূর্বে হাজার মাইল দূরে থাকা মা বাবা, ভাই বোন,ছেলে মেয়ের, প্রিয়তমা স্ত্রীর অনেকগুলো বায়না ছিল। রমজানের পূর্বে একসাথে ঈদ করার জন্য অনেকের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতিও ছিল। সে প্রস্তুতির কথা দূরে থাক, প্রতীক্ষায় থাকা প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হবে কিনা এ অনিশ্চিয়তায় দিন কাটছে প্রবাসীদের।

আমিরাতের দুবাইতে পাইপ ফিটিংয়ের প্রাত্যহিক কাজ করে উপার্জন করেন প্রবাসী শিহাব। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে সিহাবেই একমাত্র ভরসা।

সিহাব জানান ঘর বন্দি হয়ে আছি আজ অনেকদিন ধরে। পাশাপাশি আছি খাদ্য সংকটে । গত দুই মাস যাবত এখানে ঘর ভাড়া দিতে পারিনি। টাকা আর খাদ্যসংকট যে এত তীব্র হবে সেটা কল্পনাও করিনি।

সিহাব আরও জানান প্রিয় মা-বাবার বায়না ছিল এবার পাড়া-প্রতিবেশীদের একসাথে নিয়ে ইফতার করবে। ছেলে ও মেয়ের বায়না ছিল নতুন জামা কিনে ঈদ করবে।স্ত্রীর বাইনা ছিল একটু বেশি করে টাকা পাঠালে ভালো-মন্দ রান্না করে রমজানে পরিবারের সকলকে খাওয়ানো হবে। কিন্তু সবকিছু অপূর্ণ থেকে গেল।

দুবাইয়ের আরেক প্রবাসী মোঃ সাহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে আছেন, ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে খুব ভালোই দিন যাপন করছিলো। প্রতিবছর রমজান আর ঈদ বাংলাদেশে বাড়িতে উদযাপন করত। এলাকার গরীব দুঃখী মানুষদের যাকাত-ফিতরা দিয়ে সহযোগিতা করত । লক ডাউনের কারণে দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় নিঃস্ব হয়ে ঘর বন্দী হয়ে বসে আছে সাহিদুল। দেশে টাকা পাঠাতে পারিনি বলে বাড়ি ভাড়াও পরিশোধ করা হয়নি। এমনকি দেশের বাড়িতে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখার সংকটে ভুগছেন সাহিদুলের পরিবার।

শিহাব ও সাহিদুলের মত এরকম অসংখ্য প্রবাসী রমজানকে সামনে রেখে পরিবার পরিজন নিয়ে স্বপ্ন বুনে রেখেছিল।
কিন্তু মহামারী ভাইরাস করোণা পরিস্থিতি এমন মারপ্যাঁচে ফেলেছেন। নিরুপায় নির্বাক তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

ঘরবন্দি কর্মহীন ক্ষুধার্ত প্রবাসীরা বুকে পাথর চাপা দিয়ে বোবা কান্নায় বুক ভাসিয়ে চলেছেন এই করুণ পরিস্থিতিতে । যাদের উপর ভরসা করে হাজার মাইল দূর থেকে প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছেন নির্বাক হয়ে তাদের পরিবার পরিজন।

প্রবাসীদের সবার মুখে একি ফরিয়াদ, হে আল্লাহ রহম কর মোদের।
এ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আজ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে রমজানের রোজা শুরু হয়ে গেল। করোনাই আকাল ঘরবন্দি, কর্মহীন প্রবাসীরা কোন আয়োজন ছাড়াই স্বাগত জানাল মাহে রমজানকে।

প্রতিবার রমজানের পূর্বে এক রকম আনন্দ উত্তেজনা নিয়ে প্রিয় পরিবার প্রিয় স্বজনদের জন্য যে প্রস্তুতি নিয়ে থাকতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ,সে প্রস্তুতি এবার নেই। প্রবাসীদের বিশ্বাস আল্লাহর রহমতে হয়তো এই রমজানে মুক্তি মিলতে পারে করোনার তান্ডব থেকে ।

এদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের খাদ্য সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন। আমিরাত সরকার কর্তৃক রেজিস্টেশন কৃত বাংলাদেশ সমিতি , বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল সহ অসংখ্য সামাজিক সংগঠন অসহায় প্রবাসীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবেও অসংখ্য প্রবাসী সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন প্রবাসীদের জন্য। বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশ কনস্যুলেট, এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি মিলে ইতিমধ্যে দশ হাজারের অধিক প্রবাসী বাংলাদেশীকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন। তবে এই সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পেতে চলেছে বলে বাংলাদেশ মিশন কর্মকর্তারা জানান।

আমিরাতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মিশনের জন্য যে ৪০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল সে টাকায় খাদ্য সংকটে থাকা ৫ হাজার প্রবাসীর কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছানো হয়েছে বলে দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল ইকবাল হোসেন খান জানান ।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন প্রবাসীদের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ মিশনের টেলিফোন নাম্বার আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেখা গেছে অধিকাংশ প্রবাসী যাদের সামর্থ্য আছে তারা ত্রাণের জন্য নাম লেখাতে । যারা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তাদের চেয়ে ত্রানের জন্য সামর্থ্যবানদের অস্থিরতা দেখে অবাক হচ্ছি। তিনি সামর্থ্যবান প্রবাসীদের গরিবের হক কেড়ে না নেওয়ার অনুরোধ জানান।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত পারফিউম কোম্পানি আল হারামাইন গ্রুপ থেকে অসহায় প্রবাসীদের জন্য রমজান উপলক্ষে খাদ্যদ্রব্য সহ রমজান উপহার দেওয়া শুরু করেছে। আল হারামাইন গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মাহতাবুর রহমান নাসির জানান আজমানের অসংখ্য অসহায় ক্ষুধার্ত প্রবাসীদের কথা চিন্তা করে আমরা আনলিমিটেড ভাবে এই উপহার সামগ্রী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাছাড়া বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল থেকে ইতিমধ্যে ১০০০ অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশীকে খাদ্যদ্রব্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।অপরদিকে আল হারামাইন গ্রুপ সিলেট অঞ্চলেও করোনার প্রাদুর্ভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া জনসাধারণের মাঝে প্রায় ৮০ টন খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদ আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে প্রায় ১২০০ অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশীর মাঝে খাদ্যদ্রব্য বিতরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। পাশা পাশি অারো কিছু সংগঠন রমজান উপলক্ষ্যে প্রবাসীদের পাশে দাড়াতে উদ্যোগ নিচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮ হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৬৪৭ জন। করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জন। আজ বৃহস্পতিবার করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৫১৮ জন। মৃতের সংখ্যা ৪ জন। সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ৯১ জন।

আরো পড়ুন