‘এসইডিপি’ মেগা প্রকল্পে হরিলুটের আয়োজন

শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কোথায়

নিউজ ডেস্কঃ  

শিক্ষার মানোন্নয়নের ‘এসইডিপি’ মেগা প্রকল্পে হরিলুটের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা লিয়েনের নামে ছুটি নিয়ে পাঁচগুণ বেশি বেতনে সরকারের ওই প্রকল্পেই চাকরি করবেন। হাঁকাবেন কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি। নিয়মিত কর্মকর্তা নিয়োগ না দিয়ে লিয়েনে পদায়নের সুযোগ দিয়ে বেশি বেতনভাতা প্রদানের আয়োজন করেছে শিক্ষা প্রশাসন। প্রত্যেকের জন্য রাখা হয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি। এ ধরনের লোভনীয় সুযোগসুবিধা রেখেই ওই প্রোগ্রামে ন্যূনতম ৮০ জন কর্মকর্তাকে লিয়েন ও ডেপুটেশনসহ পদায়নের তোড়জোড় চলছে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে পুরো শিক্ষা প্রশাসনে। সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) আওতায় কর্মকর্তাদের জন্য ৪০টি বিলাসবহুল গাড়ির সংস্থান করা হচ্ছে।

প্রকল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পের দুর্নীতি ও অপচয় হ্রাস এবং প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ওই প্রকল্পে সরকারপ্রধানের নির্দেশনার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া সরকারের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পর্যায়ে পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও লিয়েনে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে ব্যয় বৃদ্ধির তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। মাউশির ২৪টি প্রকল্পকে একটি প্রকল্পের অধীনে নেয়ার লক্ষ্যে ‘এসইডিপি’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, মূলত মাউশির প্রকল্পগুলোর কর্তৃত্ব আমলাদের অধীনে নেয়ার লক্ষ্যেই ‘এসইডিপি’ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয়েছে।

শিক্ষার প্রকল্পে কর্মরত দু’জন পরামর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘এসইডিপিভুক্ত ২৪টি প্রকল্পের প্রতিটির জন্যই নিজস্ব জনবল রয়েছে। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকির জন্য এসইডিপির ‘প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেশন ইউনিটে’ (পিসিইউ) ৮০ জন কর্মকর্তার বিশাল ইউনিট গঠন হচ্ছে। এ ধরনের ইউনিট সমন্বয়ের জন্য ১৫/২০ জনের জনবলই যথেষ্ঠ। বিশাল জনবল নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পগুলোতে লুটপাটেরই আয়োজন করা হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর শেখ ইকরামুল কবির  বলেন, ‘সরকার থেকে লিয়েনে ছুটি নিয়ে আবার সরকারের প্রকল্পেই চুক্তিতে চাকরি করা অনেকটা কৌশলে দুর্নীতি করার শামিল। এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হওয়া উচিত। এমন প্রোগ্রামের কথা শিক্ষানীতিতেও বলা নেই। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার প্রকল্পগুলোর মাঝামাঝি ও নিচের স্তরে শিক্ষকদের পদায়ন করতে হবে। টপ লেভেলে আমলারাও থাকতে পারে।’

এসইডিপির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা প্রকল্প দলিল) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রোগ্রামের প্রধান ‘ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’ হবেন গ্রেড-২ এর সমমানের কর্মকর্তা অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব। প্রকল্প দলিলে তার বেতনভাতা নির্ধারণ করা হয়নি। যদিও বর্তমানে সরকারের একজন অতিরিক্ত কর্মকর্তা প্রায় এক লাখ টাকা বেতনভাতা পান।

প্রকল্প দলিলে তার অধীনন্থ একই গ্রেডের ‘সিনিয়র কলসালটেন্ট’ (পরামর্শক) হিসেবে একজন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটরের (অতিরিক্ত সচিব, লিয়েনে পদায়ন পাবেন) বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

অতিরিক্ত প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (গ্রেড-৩ অর্থাৎ যুগ্ম-সচিব) হিসেবে চারজন সিনিয়র কনসালটেন্ট পদায়ন পাবেন, যাদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। তাদের লিয়েনে পদায়ন করা হবে। সাধারণত সরকারের একজন যুগ্ম-সচিব প্রায় ৮০/৯০ হাজার টাকা বেতনভাতা পান।

ডেপুটি প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (গ্রেড-৪/৫,উপ-সচিব সমপর্যায়ের) হিসেবে আটজন কনসালটেন্ট লিয়েনে পদায়ন পাবেন, যাদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা।

অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (গ্রেড-৬, সিনিয়র সহকারী সচিব সমপর্যায়ের) হিসেবে ১৬ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট নিয়োগ পাবেন, যাদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা করে।

এই প্রোগ্রামে মোট ৮০ জনের কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হবে। তাদের মধ্যে ৩০ জনই নিয়োগ পাবেন লিয়েনে ও দু’জন নিয়োগ পাবেন ‘ডেপুটেশনে’ (প্রেষণ)। অন্যদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিশেষ করে আমলারা এ প্রোগ্রামে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাবেন।

সাধারণত বিদেশি সংস্থায় কাজে যোগদানের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ‘লিয়েন’ ছুটি মঞ্জুর করা হয়। এক্ষেত্রে কিছু বিধিবিধান মেনে নিতে হয়। বিশেষ করে লিয়েনকালীন সাধারণ তহবিল চাঁদা, কল্যাণ তহবিল ইত্যাদি থেকে গৃহীত অগ্রিম সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

এসইডিপিতে ‘লিয়েন’ ও ‘ডেপুটেশনে’ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব- এই তিন স্তরেই পদের চেয়ে দিগুণ ও তিনগুণ কর্মকর্তা রয়েছেন। এত কর্মকর্তা থাকতে প্রকল্পে লিয়েনে নিয়োগ দিতে হবে কেন? তাছাড়া সাধারণত বিদেশ কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করতে সরকারি কর্মকর্তা লিয়েন ছুটি নিয়ে থাকেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানেই কেন লিয়েনে পদায়ন করতে হবে? উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করতে গিয়ে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, যা কাম্য নয়।’

গাড়ি পেতে তোড়জোড়

টিচিং কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট-২ ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (টিকিউআই-২) প্রকল্পের বাস্তবায়ন সমাপ্ত হয়েছে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শতাধিক গাড়ি কেনা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, বাস্তবায়ন শেষে প্রকল্পের সব গাড়ি মাউশির কাছে হস্তান্তর করা কথা। গাড়ি হস্তান্তরের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছিল মাউশি কর্তৃপক্ষ। কারণ মাউশিতেও গাড়ি সংকট তীব্র। অনেক কর্মকর্তাকে সাধারণ যানবাহনে চলাচল করতে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে টিকিউআই প্রকল্পের সব গাড়ি এসইডিপির অধীনে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য সম্প্রতি নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘টিকিউআই প্রকল্পে ব্যবহৃত যানবাহন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের গত ১১ জুলাইয়ের জারিকৃত এক পত্র অনুযায়ী সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় প্রণীত ‘ম্যানেজমেন্ট, টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন অব এসইডিপি’ শীর্ষক স্কিমে ব্যবহার করা হবে। এমতাবস্থায়, সমাপ্ত টিকিউআই-২ প্রকল্পের গাড়ি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে হস্তান্তর করার পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর থেকে এসইডিপিতে হস্তান্তরের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এসইডিপির আওতায় ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার সব সংস্থা তথা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), ব্যানবেইস, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি), সব শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), ডিআইএ, এইচএসটিটিআই, বিএমটিটিআইসহ শিক্ষার সব কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিচালিত হবে। অথচ এই কর্মসূচি প্রণয়নে ওইসব সংস্থার কোন মতামত গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও এ ধরনের প্রোগ্রাম সর্ম্পকে কিছু বলা হয়নি।

৫ বছর মেয়াদি এ প্রোগ্রাম ২০১৮ থেকে ২০২২ অর্থবছর মেয়াদে বাস্তবায়ন হবে। এ কর্মসূচির প্রাক্কলিত ব্যয় ১৭.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার (১৭ হাজার ২০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার)। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ১৬ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। অবশিষ্ট ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নের পরিমাণ হবে ২২৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। বিশ্বব্যাংক আরও ১০ মিলিয়ন ইউএস ডলার জিএফএফ গ্রান্ট হিসেবে প্রদান করবে।

অর্থাৎ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৯৫ শতাংশ অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ৫ শতাংশ ব্যয় বহন করবে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোসহ মোট ছয়টি সংস্থা। শর্তানুসারে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হলে এসব সংস্থা প্রকল্পে ভূতাপেক্ষভাবে ঋণ দেবে।

প্রকল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মসূচির প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যয় বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। অথচ এটি সম্পূর্ণ বিশ্ব ব্যাংকের উন্নয়ন কর্মসূচির আদলে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে কৌশলে বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব ও স্বার্থকে অপেক্ষাকতৃ কম গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণে একনেকের অনুমোদন নেয়া হয়নি।দৈনিক সংবাদ

কেএ/সময়ের কন্ঠ

আরো পড়ুন