আবুল কালাম আজাদের “নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব”

আবুল কালাম আজাদ, লেখক ও সাংবাদিক

সুন্দরের প্রয়োজনে নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা অসীম। যে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ যত বেশি সে সমাজ তত সুখী ও সমৃদ্ধ। সমাজে নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের অভাব হলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। আর ন্যায় বিচার যেখানে অনুপস্থিত সেখানে শান্তি নির্বাসিত। তাই সমাজ জীবনে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সমাজ জীবনে চরম দারিদ্র্য, শিক্ষিত বেকারের কর্মহীনতা, ভোগবাদী মানুষের বিলাসী প্রতিযোগিতা, আপাত স্বার্থের লোভে পতিত হওয়া, জাতীয় জীবনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকা, ধর্মীয় বিধি নিষেধকে গুরুত্ব না দেয়া ইত্যাদি কারণেই মানুষ তার নৈতিক মূল্যবোধ হারায়। মানুষ যখন নৈতিক মূল্যবোধ হারায় তখন প্রকৃতপক্ষে তার উৎকৃষ্ট চরিত্রকেই হারায়। আর মানুষের চরিত্রই যখন থাকেনা তখন আর অন্য কিছু থাকলেই বা কী।

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলাফল হচ্ছে-অসুন্দর সমাজ। সমাজ জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি আর অনিয়ম নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরই ফল। মানব সভ্যতা যখন চরম উন্নতির পথে ধাবমান তখন পরিতাপের হলেও স্বীকার্য-আমাদের দেশে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। ফলে দুর্নীতিতে সর্বোচ্চ শিখরে আসীন আমাদের দেশ।

মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলেই সমাজে দুর্বৃত্তের দল অন্যায় সংঘটনে সাহস পায়। চাঁদাবাজি, রাহাজানি ও অরুচিপূর্ণ বিনোদনে মানুষ মত্ত থাকে তখনি মানুষের মূল্যবোধ থাকে না। একটি সমাজে বা জাতির জীবনে মূল্যবোধের এমন অবক্ষয় কাটিয়ে উঠতে না পারলে তারা নিক্ষিপ্ত হবে আস্তাকুঁড়ে। সভ্য জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে নৈতিক মূল্যবোধের পতনকে রুখে দিতে হবে।

নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের এ অবক্ষয় রোধ করার দায়িত্বটি প্রথমে ব্যক্তি নিজে এবং পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। নিজে ব্যক্তিগতভাবে সুনীতি ও শুভবোধ চর্চার মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নীতিবোধসম্পন্ন দক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে নৈতিক মূল্যবোধে রাজনীতির পরিসর খুবই বৃহৎ। রাজনীতি দেশ ও জনগণের আমূল কল্যাণের জন্য আবর্তিত হয়। এতে মূল্যবোধ আর ন্যায্যতার ভিত্তি মজবুত না থাকলে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই হয় বেশি। রাজনীতিকদের যদি মূল্যবোধের স্তর নিম্নমানের হয় তবে তা আর রাজনীতি থাকে না বরং অপরাজনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর কুপ্রভাবে হাজারো মূল্যবোধ নষ্ট হয়। ব্যক্তির মূল্যবোধ নষ্ট হলে ক্ষতি শুধু একজনের কিন্তু শাসক শ্রেণীর মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই প্রবাদ আছে, ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট প্রজা কষ্ট পায়’। আমাদের প্রেক্ষাপটও বোধহয় তা থেকে আলাদা নয়।

অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে ধর্মবিমুখতা, ধর্মের অপব্যবহার, ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব এবং সর্বগ্রাসী অশ্লীলতার মতো আরো কিছু বিষয়। ধর্মের যথাযথ চর্চা ও অনুশীলন কখনোই ধর্মান্ধতা শেখায় না বরং ধর্মীয় আদর্শের মাধ্যমেই ধর্মান্ধতার অভিশাপ মুক্ত হওয়া সম্ভব। ধর্মই মানুষের জীবনপ্রণালী অন্যান্য ইতর প্রাণী থেকে আলাদা করেছে; মানুষকে সভ্য, সংবেদনশীল ও পরিশীলিত করেছে। সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে আমরা ধর্মকে মনে করি এগিয়ে চলার পথের প্রধান অন্তরায়। কিন্তু বাস্তবতা সে ধারণার অনুকূলে কথা বলে না।

প্রতিটি সভ্যতাই গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো ধর্মকে আশ্রয় করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেটি ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি সৃষ্টি ও অবক্ষয়হীন সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্প্রসারণ, লালন ও অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। মনীষী সাইয়্যেদ কুতুবের ভাষায়, ‘যে সমাজে মানবীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রাধান্য থাকে সে সমাজই সভ্য সমাজ’।

আরো পড়ুন