অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনায় ভবদহ এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত-

স্বীকৃতি বিশ্বাসঃ
বাংলাদেশ কৃৃষি প্রধান দেশ।এখানকার নদ-নদী,খাল- বিলের পানি কৃষকের কৃষিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে তেমনি এটেল-বালু ও নদী বিধৌত বালু-দোঁয়াশ মাটি ভূ-পৃষ্ঠ গঠনের সাথে সাথে কৃষিকে করেছে সমৃদ্ধ।ফলে মানব সভ্যতা হয়েছে বিকশিত ও বিস্তৃত এবং প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের দক্ষিণ- পশ্চিমের বঙ্গোপসাগর ও সুন্দর বনের কোল ঘেষে গড়ে উঠেছে সাতক্ষীরা, খুলনা,বাগেরহাট ও যশোর জেলা। এই জেলায় বসবাসরত মানুষের জীবন ও জীবিকা কৃষির উপর নির্ভরশীল। এলাকার মানুষের ভাষা,সাহিত্য, সংস্কৃতি,কৃষ্টি কালচার জীবন ও জীবিকার সাথে সুদীর্ঘকাল ধরে জড়িয়ে আছে নদ-নদী খালবিল ও বনজঙ্গল।
যশোর জেলার একাংশ,অভয়নগর,মনিরামপুর ও কেশবপুরের বৃহদাংশ এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার সামান্য অংশের জনবসতি নিয়ে গড়ে উঠা জনপদের দুঃখগাঁথার জন্য দায়ী মুক্তেশ্বরী- টেকা- হরি ও আপারভদ্রা- হরিহর- বুড়িভদ্রা খরস্রোতা নদীগুলির সংযোগ স্থলে গড়ে উঠা ভবদহ স্লুইসগেট।
নদীগুলোর অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করলে বুঝা যাবে নদীগুলি কিনা বেহাল দশায় আছে।মানুষের দুঃখের কথা বলার ভাষা আছে,লোক আছে কিন্তু নদীগুলোর অন্তঃক্ষরণ বলার ভাষাও নেই লোকও নেই।
নদীগুলোর অতীত ও বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা জরুরি।
মুক্তেশ্বরী টেকা নদীটি যশোর জেলার মনিরামপুর থানার কাশিমনগরের বাদিয়াতলা বিল অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে যশোর সদর উপজেলা পেরিয়ে অভয়নগর উপজেলার পয়রা পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে হরি নদীতে পড়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ৪০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৪২ মিটার।নদীটির গতিপ্রকৃতি সর্পিলাকার।উজানের তুলনায় ভাটির দিকে অধিক প্রশস্ত।ভাটিতে পানি প্রবাহের মাত্রা উজানের তুলনায় বেশি। নদীটি জোয়ার ভাটার প্রভাবে প্রভাবিত।
নদীটি ভবদহ স্লুইসগেটের কারণে পলি পড়ে প্রস্থ ও গভীরতা কমতে কমতে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম।নদীটির ৪০ কিলোমিটারের অধিকাংশ জায়গায় শেওলা দ্বারা পরিপূর্ণ। কোথাও নদীতে অবৈধ বাঁধদিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করে। কোথাও বা নদীর ভিতর দখল নিয়ে দোকানপাট তৈরি করে ব্যবসা- বানিজ্য করা হচ্ছে।
নদীটিকে দখলমুক্ত করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে ব্যর্থ হয়েছে। নদীটি খনন করে পূনরায় নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও অপরিকল্পিত ও নয়ছয়ভাবে কাজ করার জন্য সম্ভব হয়নি।আর তাই নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য পরিকল্পিত ও দীর্ঘ মেয়াদি নদী ড্রেজিংসহ নদী ব্যবস্থাপনা নীতি সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে হয়তো নদীটি তার অতীত সৌন্দর্য্যে ফিরতে পারতো।
হরি নদীটি অভয়নগর উপজেলার পায়রা নামক স্থান হতে মুক্তেশ্বরী টেকা নদী থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এরপর এই নদীটির স্রোতধারা খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার খরনিয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে হাপর নদীতে মিশেছে।নদীটির দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৫১ মিটার।নদীটির গতিপ্রকৃতি সর্পিলাকার।
নদীটি উজানের তুলনায় ভাটির দিকে অধিক প্রশস্ত।নদীতে সারাবছর পানি প্রবাহিত হয়।একসময় ছোটবড় নৌযান চলাচল করতো।সমুদ্র উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীটিতে জোয়ারভাটা প্রবাহিত হয়।
হরিনদীটিও ভবদহের স্লুইসগেটের কারণে প্রস্থ ও গভীরতা দুটোই হারাতে বসেছে। নদীটির অধিকাংশ জায়গায় পলি পড়ে খালে পরিণত হয়েছে।জোয়ারের পানি প্রবেশ করলেও স্রোতের গতিবেগ কম হওয়ায় ভাটায় পানি পুনরায় ফিরে যেতে গিয়ে বাঁধার সম্মুখীন হওয়ায় ঘোলা পানিতে থাকা অতিরিক্ত পলি জমতে জমতে নদীটির জীবনযৌবন হারিয়ে মৃত প্রায়।
নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য নদীটি খনন করে নদী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করা অতি জরুরি।
হরিহর নদীটি মনিরামপুর উপজেলায় রুহিতা এলাকায় প্রবাহমান কপোতাক্ষ নদ হতে উৎপত্তি লাভ করলেও বর্তমানে উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মনে হয় কশিমনগরের নিম্নজলাভূমি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ৩৬ কিলোমিটার ও গড় প্রস্থ ১৮ মিটার।নদীটি সর্পাকারে মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন নামে হাপর নদীতে মিশেছে। নদীটি জোয়ার ভাটার প্রভাবে প্রভাবিত।
নদীটির অনেকাংশে এখন পলি জমে খালের মতো হয়ে গিয়েছে।নদীর কিছু অংশে পানি থাকেনা। নদীর জলপ্রবাহ নেই বললেই চলে। ফলে এই এলাকার বিলগুলির পানি অপসারিত হতে না পেরে কেশবপুর অংশে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
নদীটি সংষ্কার ও খননের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেও অপরিকল্পিতও নয়ছয়ভাবে কাজ করার জন্য নদীটি এখন মৃতপ্রায়।
যশোর জেলার একাংশ,অভয়নগর,মনিরামপুর ও কেশবপুর জেলার বৃহদাংশ এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার কিছু এলাকার ২৭ টি বিলের পানি অপসারণ ও সমুদ্রের লবনাক্ত পানির হাত থেকে ফসলের মাঠ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অভয়নগর,মনিরামপুর,কেশবপুরও ডুমুরিয়ার সীমান্তবর্তী অভয়নগরের ভবদহ নামক স্থানে হরিহর- টেকা নদীর উপরে ষাটের দশকে ২১,৯ ও ৬ ভেন্ট স্লুইসগেট গেট তৈরি করা হয়।স্লুইসগেট নির্মাণের পর আশির দশক পর্যন্ত অত্র এলাকার জনপদের জন্য সুফল বয়ে আনে।কিন্তু স্লুইসগেট তৈরি করার কারনে নব্বইয়ের দশকে প্রবাহমান মুক্তেশ্বরী-টেকা- হরি ও আপারভদ্রা- হরিহর- বুড়িভদ্রা খরস্রোতা নদীগুলি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে আশা পলি জমে তার জীবন- যৌবন,সার্বিক সৌন্দর্য হরিয়ে ফেলে। সাথে সাথে ঐ এলাকায় বসবাসরত জনগণেরও সুখের দিন শেষ হয়ে দুঃখের দিন শুরু হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে শুরু হওয়া দুঃখকে কিছুটা প্রশান্তি এনে দিয়েছিল নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বাস্তবায়িত টিআরএম( টাইডার রিভার্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম)। কিন্তু কোন অদৃশ্য কারনে এই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়।তখন বিংশ শতাব্দীতে পুনরায় শুরু হয় ভবদহ এলাকার দুঃখ গাঁথা যা একাবিংশ শতাব্দীতে আজও বর্তমান।
যেহেতু অত্র এলাকার জীবন-জীবিকা নদী কেন্দ্রিক সেহেতু নদীগুলোর নাব্যতা হারানোর সাথে সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য হারাতে বসেছে। অনেক গাছপালা,পশুপাখি, জীবজন্তুও বিলুপ্ত হতে বসেছে।
নদীতে পলি জমে নদীর তলদেশের গভীরতা নষ্ট হয়ে ২৭টি বিলের পানি অপসরণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে বিলগুলিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।সারাবছর বিলগুলি পানিতে ভরে থাকে ফলে বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টি হলেও বিলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ,রাস্তাঘাট,হাটবাজার, স্কুল-কলেজ ধর্মীয় প্রতিষ্টান সবই পানিত নিমজ্জিত থাকে এবং মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং জনজীবন হচ্ছে বিপর্যস্ত।

আরো পড়ুন